Wednesday, 20 January 2016

আদর্শলিপি



১৯৯৫ সালের দিকের কথা।
খুলনা জিলা স্কুলের মেইন রোডের উল্টা পাশে মুক্তা বই ঘর নামের একটা দোকান ছিল (এখন আছে কিনা জানি না)। এক সপ্তাহের জন্য বই ভাড়া দিত। সপ্তাহ প্রতি দুই টাকা। বেশির ভাগ পাওয়া যেত তিন গোয়েন্দা আর মাসুদ রানা। (সেবা প্রকাশনীর কাছে জাতির আসলে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। একটা বিশাল জনগোষ্ঠীকে এই প্রকাশনী বই পড়তে শিখিয়েছে)। অনেক কস্ট করে টাকা জোগাড় করতে হত। দুই টাকা মানে অনেক টাকা। তারপর বই পড়ার একটা ঝক্কি তো ছিলই! লুকিয়ে লুকিয়ে পড়া। বেশীর ভাগ সময়ে খেলার নাম করে মাঠে গিয়ে পড়তাম। এখন গল্প বলে মনে হলেও এটাই সত্য যে আগে যারা গল্পের বই পড়ত তাদের অধিকাংশই ক্লাসের বইয়ের নীচে রেখে বই পড়া শুরু করেছে (হাল আমলের নাটক সিনেমাতেও এই ঘটনা দেখায়)!
চাকুরী জনিত কারনে বাবা বদলি হয়ে চলে এলেন সাতক্ষীরা। আমাদের বাসা নেওয়া হল পলাশপল নামক একটা জায়গায়। ভর্তি হলাম সাতক্ষীরা জিলা স্কুলে। আমার জন্য বরাদ্দ দেয়া হল দিন প্রতি দশ টাকা। দুই বারের রিকশা ভাড়া চার টাকা করে আট টাকা আর টিফিনের বরাদ্দ দুই টাকা। স্কুলে যাবার সময় কিছুটা হেটে তারপর রিকশাতে উঠতাম। এক টাকা বেচে যেত। ফেরার সময় কোন বন্ধুর সাইকেলে। আর টিফিনের টাকা যদি বাচাতাম তাহলে তো পোয়াবারো। প্রতি সপ্তাহে গড়ে দুইটা করে বই কেনা হত।  
বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঠার পর নিলক্ষেতকে তীর্থ স্থান মনে হত। সীমিত টাকা। কিন্তু অসংখ্য বই। কি কিনব বুঝে উঠতে পারতাম না। রেল স্টেশন আরও একটা প্রিয় জায়গা ছিল। নতুন বের হওয়া প্রায় সব বই স্টেশনের বুক ডিপো গুলতে পাওয়া যেত।  
সাম্প্রতিক সময়ে ফিরে আসি।
কিছু দিন আগে কোন এক কারনে কয়েকদিনের জন্য রামপুরা থাকতে হয়েছিল। হাতে তেমন কোন কাজ নেই। বের হলাম বই কেনার জন্য। অদ্ভুত বিষয় হল, পুরো রাম্পুরা বাজার চষে ফেলেও আমি কোন মান সম্মত বইয়ের দোকান পেলাম না। অথচ আগে প্রতি পাড়া-মহল্লাতে কম করে হলেও দুটো করে বইয়ের দোকান দেখা যেত। এলাকার বেকার যুবকদের কর্ম সংস্থানের রাস্তা ছিল হয় কোচিং সেন্টার নয়ত বইয়ের দোকান। নিলক্ষেতেও এখনও প্রচুর বই। কিন্তু অমুক পরীক্ষার প্রস্তুতি গাইড অথবা রান্না-সেক্স-৩০ দিনে ভাষা শিখুন বইয়ের যে পরিমান প্রাচুরজ্য তার তুলনায় গল্প প্রবন্ধের বই নেই বললেই চলে। রেল স্টেশনের বুক ডিপো গুলতে এখন চা-পান-সিগারেটের দোকান।
বইয়ের বাজার প্রথমে দখল করে মোবাইলের দোকান। তার পরে ডিভিডি। বর্তমানে সাইবার ক্যাফে। এখন ইন্টারনেটে ই-বুক নামে প্রচুর বই পাওয়া যায়। অনেক অনলাইন বাজার ই-বুক রিডার নামক একটি ডিভাইস  বিক্রির চেস্টা চালাচ্ছে। কিন্তু নতুন অথবা পুরাতন একটা বই হাতে নিয়ে পাতা উল্টে পড়ার যে ফ্লেভার তা কেন যেন এই মোবাইল অথবা কম্পিউটার স্ক্রিনে পড়ে সেই মজাটা পাই না। হয়ত আমরা ব্যাকডেটেড হয়ে গেছি!
বর্তমান প্রজন্ম কেন জানি আশংকাজনক ভাবে পাঠ্য পুস্তক ছাড়া অন্য বই পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। (অবশ্য পাঠ্য পুস্তকের প্রতিও যে এদের অনেক আগ্রহ আমি সে কথা জোর গলায় বলছি না)যারা কিছুটা বই পড়েন তারা হুমায়ূন আহমেদ অথবা মুহাম্মদ জাফর ইকবালেই থেমে আছেন। বাংলাদেশী সাহিত্য জগতে এই দুইজনের অবদান অসামান্যকিন্তু এই দুই জনের বাইরেও একটা জগত আছে। এক সময় কৈশোর শুরু হত মাসুদ রানা কিংবা তিন গোয়েন্দার হাত ধরে। তারপরে বাধ্যতামূলক ভাবে আসত সমরেশ এর গর্ভধারিণী। কৈশোরের রোমান্টিসিজমের জন্য নিশ্চিত করা ছিল শেষের কবিতা আর মেমসাহেবসাথে হুমায়ূন আহমেদ আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তো ছিলেন ই। নব্বুই এর দশকে বই পড়ত অথচ হেলাল হাফিজের যে জলে আগুন জ্বলে পড়ে নাই এমন মানুষ হাতে গুনে বলে দেয়া যায়। আর একটু পরিনত হলেই হুমায়ন আজাদ।
এখনকার তরুন্দের মাঝে কবিতা পড়ে এমন সংখ্যাটা খুজতে হয়ত আতশী কাঁচ লাগবে। যারা পড়েন তাদেরকে, যারা পড়েন না, তারা ঠোঁট বাকিয়ে বলেন আঁতেল। আবার যারা পড়েন তাদের অধিকাংশই কেন জানি নিজেদের আলাদা করে দেখতে পছন্দ করেন। গালে দাড়ি চুলে বাবরি কিংবা হাতে শান্তি নিকেতনি ব্যাগ আর পায়ে চটি। আসলেই কি সাহিত্য সচেতন হবার জন্য এই গেট আপের তুমুল দরকার?
যে ছেলেটা সন্ধ্যায় ঘন্টার পর ঘন্টা পার করে দেয় পুল খেলতে অথবা গলির মোড়ে চায়ের দোকানে, যে মেয়েটা রাতভর সময় দেয় ফেসবুককে বা তার ফোন ফ্রেন্ড কে সেই মানুষগুলোর হাতে কেন আমরা বই তুলে দিতে পারছি না তা ভেবে দেখা দরকার। শুধু মাত্র জীবন যাত্রার মানের পরিবর্তন অথবা সময় অনেক বদলে গেছে এই দোহাই দিয়ে আসলেই কি পার পাওয়া যাবে?
বেশ কয়েকজনের সাথে কথা হল বই পড়া নিয়ে। তাদের কথাও যুক্তিযুক্ত। তারা বলছেন এখনকার সময়ে প্রায় সমস্ত বিখ্যাত বই নিয়েই মুভি তৈরি হচ্ছে। তারা সবাই মুভি দেখছেন। কিন্তু মুভিটা দেখার আগে যদি বইটা পড়া থাকে তবে দেখার অনুভুতি বেড়ে যায় কয়েকগুণ। মনে করুন দ্যা ভিঞ্চি কোড বইটাতে প্যারিসের ল্যুভর মিউজিয়ামের বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া আছে। ৬৬৬ টুকরা দিয়ে তৈরী কাচের পিরামিডের কথা বলা আছে। পড়ার সময় নিজের ভেতর এক ধরনের কল্পনা তৈরী হয়। সেই কল্পনার বাস্তব রুপ যখন চলচিত্রের রুপালী পর্দায় ফুটে ওঠে তখন এক অন্য ধরনের আবেশ কাজ করে। আবার অনেক সময় চলচিত্র বইয়ের সত্ত্বার সব কিছু তুলে ধরতে পারে না। বইয়ের পাতার শারলক হোমস মুভির চেয়ে অনেক আলাদা, অনেক বেশী জীবন্ত, প্রাণবন্ত। সত্যি কথা বলতে কি, বই এর বিকল্প আসলে আর কিছুই হতে পারে না, বই বইই।  
বিতর্কের বিচার কাজ করছি প্রায় বছর দশ হতে চলল। শেষ কবে কোন বিতর্কে কোন বিতারকিক দুটো কবিতার লাইন বলেছিল মনে করতে পারি না। বিশয়ের সাথে সাহিত্যের যোগসূত্র দেখানো তো অনেক দুরের বিষয়। আমি বলছি না যে এরা ভাল বিতর্ক করে না, কিন্তু সব বিতর্কই কেন জানি এক রকম মনে হয়। অনেকটা বাংলা ছায়াছবির মত। প্রথম দশ মিনিটেই বলে দেয়া যায় শেষের অংকে কি হবে!
নতুন লেখকদের বই আমরা খুব বেশী প্রচার না পেলে পড়ি না। এঁরা নিজের পকেটের টাকায় বই ছাপিয়ে হতাশ হয়ে বসে থাকেন বই মেলায়। এদের উতসাহ দেয়াটা অনেক জরুরী। 
অনেক দিন ধরে পড়ে থাকলে বইয়ের মলাটে যেমন ধুলো পড়ে যায় তেমনি বই পড়ার আগ্রহের ওপর ও কেমন যেন একটা আস্তরণ পড়ে গেছে। এই ধুলো পরিস্কার করার উদ্যগ আমাদের ই নিতে হবে নতুন করে। যুক্তিবাদী সমাজ গড়ার প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে বই পড়ার আগ্রহকে আবার জাগিয়ে তুলতে হবে, এর অন্য কোন বিকল্প নেই।
প্রতিটি বিতর্ক ক্লাবে একটি করে লাইব্রেরী গড়ে তোলাটা কি খুবই অসম্ভব কাজ?

Monday, 26 January 2015

রাত জেগে কুড়নো জোছনা




০১.
অল্প বয়সে একটি বিতর্ক সংগঠনের সভাপতি হয়ে গেলাম। তিথি আপুর পর ইংরেজী বিভাগের প্রাধ্যান্য ছাড়িয়ে আমি। পূর্ণ কোন কমিটি ছিল না। আমি সভাপতি আর ৩২ ব্যাচ ইংরেজী বিভাগের কয়েকজনকে দিয়ে একটি কোনোমত কমিটি দিয়ে চলে গেলেন তানভীর ভাই (২৭ আবর্তন, ইংরেজী) কোন ফান্ড ছিল না। তাও চেষ্টা করছিলাম। পরে রাজন দা, আদনান, স্তাফিজ, অপু, শায়ের, সৈকত ওরা সবাই এল। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল একজন শ্রদ্ধেয় বড় ভাইএর অফসাইট সুপার ভিশন। তবুও চলছিল। ১৯৯৯ সালের পর ক্যাম্পাসে কোন আন্ত বিশবিদ্যালয় প্রতিজগিতা হয়নি। আমরা চেষ্টা শুরু করলাম। এরই ফাঁকে ক্যাম্পাসের বিতর্ক প্রেমী সবাই কে এক জায়গায় নিয়ে আসার একটা ভয়ানক চেষ্টা চালালাম। সনেট ভাই (তখন প্রভাষক, পরিসংখ্যান বিভাগ সর্ব শেষ সভাপতি, Jahangirnagar University Debating Club), নাহরীন আপু (তখন প্রভাষক,ভুগল পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ) অনেকটা ভালবেসে এগিয়ে আসলেন। দৈনিক ইত্তেফাক স্পন্সর কনফার্ম করল। ডিজাইন এর সব কাজ বিনা পয়সায় করে দিলেন সনেট ভাই এর ছোট ভাই ম্যাক্সিম। কিন্তু আমার সেই বড়ভাই মেনে নিতে পারলেন না। হটাত একদিন একটি পত্রিকায় ছোট একটি খবর দেখলাম যে আমার বিতর্ক সংগঠনের নতুন কমিটি ঘোষণা করেছেন বড় ভাই। তখন আমার ইয়ার ফাইনাল পরিক্ষা চলছে। কেউ মেনে নিতে পারেনি বিষয়টি। সবাই বলছিল যে চালিয়ে যা। দেখি ক্যাম্পাসের বাইরের একজন কি করতে পারে। কিন্তু কাদা ছড়াছুড়ির বিশয়টা আমাদের কারোরই পছন্দ ছিল না। 
সিদ্ধান্ত নিলাম একটি বিতর্ক সংগঠন জন্ম দেব কয়েকজন মিলে। প্রান রসায়নের জটিল সমীকরন লিখে চলেছি খাতায় আর মাথার ভেতর ঘুর ঘুর করছে সংগঠনের নানা বিধ বহুমুখী সমীকরণ। দুটি পরীক্ষার মাঝে বিরতি ছিল চারদিনের। কথা হল অসংখ্য মানুষের সাথে। আতিক স্যার (অধ্যাপক এ টি এম আতিকুর রহমান) সাহস দিলেন। বললেন পাশে থাকবেন। কি হতে পারে নতুন নাম? অনেকে প্রস্তাব দিলো Jahangirnagar University Debating Club কে নতুন করে নতুন রুপে ফিরিয়ে আনার। কিন্তু আমরা সবাই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলাম নতুন কিছু করার। সন্ধায় ট্রান্সপোর্টে রুবাইয়াৎ দা (রুবাইয়াৎ চৌধুরী, ২৬ আবর্তন, নাতক ও নাট্যতত্ত্ব) দুস্টুমীর ছলে বলে বসলেন বিতর্ক নিয়ে জুডো কারাতে শুরু করে দিলি দেখি। তখনই মাথায় নামটা প্রথম আসল। JUDO-JAHANGORNAGAR UNIVERSITY DEBATE ORGANIZATION. ব্যকরনগত ভাবে নামটা ঠিক আছে কিনা জানতে ছুটলাম সুদীপ’দা (২৭ আবর্তন, ইংরেজী) এর কাছে , যাকে আমরা জীবন্ত ডিকশনারী বলে ডাকতাম। দাদা জানালেন ঠিক আছে। দাদার সাথে কথা বলেই ঠিক হোল শ্লোগান। Let…..be lightened . তখন ও এই সব চিন্তা বা কর্মকাণ্ডগুলো শুধুই নিজের ভেতর। অনুমোদন বা স্বীকৃতি পায়নি অন্যান্য যোদ্ধাদের কাছে।
২০০৫ সালের ২৩ ডিসেম্বার। রাজন’দা, আদনান, মস্তাফিজ, অপু, শায়ের, সৈকত সবাই আমার রুমে (৮০৩ আল বেরুনী এক্সটেনশন)। কোথায় বসা যায়? বাইরে ভয়ানক ঠান্ডা। তখন আমি বাঁধন জাবি জোনের সভাপতি। ঠিক হল বাধনের রুমে বসব। দীর্ঘ আলোচনা শেষে সাত জোড়া উজ্জ্বল চোখের প্রত্যয়ী একাত্মতায় জন্ম নিল একটি সংগঠন।
JUDO-JAHANGORNAGAR UNIVERSITY DEBATE ORGANIZATION.

০২.

সারা দেশে অস্থিরতা। জঙ্গী হামলার আশংকায় বন্ধ রয়েছে দীর্ঘদিন কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এমন সময় JUDO সিদ্ধান্ত নিল আত্মপ্রকাশের। ঠিক হল ১৪ ফেব্রুয়ারী ভালবাসা দিবসে অনুষ্ঠান করার। সাধ আছে কিন্তু সাধ্য নেই। রয়েছে শুধু কিছু মানুশের অদম্য সাহস। এমন সময় সহযোগিতার হাত বাড়ীয়ে দিলেন শয়েব ভাই (চেয়ারম্যান, ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন)সময় হাতে মাত্র তিনদিন। অসম্ভব একটা চ্যালেঞ্জ। অনেক বাধা। অনুমতি দিতে চাইছে না প্রশাসন। শেষে রেজিস্ট্রার স্যার বললেন যে আমরা অনুমতি দিচ্ছি তবে তুমি সাভারে UNO সাহেবকে জানিয়ে রেখ। চিঠি হাতে ছুটলাম সাভার। অনেক কথার পর তিনি কনভিন্সড। কথা দিলেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাশনের পাশাপাশি তিনিও অতিরিক্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবেন।
সময় মাত্র দুইদিন। এখনকার মত হুট করে পোস্টার ছাপানর ট্র্যাডিশন বা ক্ষমতা তখনকার সংগঠন গুলর ছিল না। আমাদের তো আরও না। সবমিলিয়ে বাজেট ছয় হাজার টাকা। আনন্দনের রাজু ভাই আমাদের নিজের হাতে অসাধারন একটা ব্যানার তৈরী করে দিলেন। বাঁশ কাগজে তৈরী হল ১৪টি পোস্টার। অসাধারন এবং হয়ত এখন পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ মাইকিং করল আদনান, মাঝে মাঝে যোগ দিল সবাই, এমনকি ইংরেজী বিভাগের অধ্যাপক আহমেদ রেজা পর্যন্ত। 
১৪ ফেব্রুয়ারী ২০০৬. আমার দেখা বাংলাদেশএর সবচেয়ে বেশী দর্শক উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হোল ভালবেসে ভালবাসার বিতর্ক। পাচ হাজার আসনের মুক্তমঞ্চ পুরোটা ভরে যাবার পর দর্শক বসেছে মাটিতে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বারোজন বিতারকিক নিয়ে হল দুইটি বিতর্ক। বিশ্বাস করি আমৃত্যু অই পাচ হাজার দরশকের মনে মুক্তমঞ্চের এই অনুষ্ঠান অমলিন হয়ে থাকবে।
০৩.
কেটে গ্যাছে কয়েকটি বছর। বিতর্ক বলতে, বিতর্ক সংগঠন বলতে ক্যাম্পাস ও ক্যাম্পাসের বাইরের সবাই একনামে চেনে JUDO কে। হীম তখন প্রেসিডেন্ট। মাসের নামটা ঠিক মনে নেই। ১৫,১৬,১৭ ঘোষণা দেয়া হয়েছে আন্ত বিভাগ বিতর্কের। কোন স্পন্সর নেই। চাকরী ও পাই নাই। হঠাত মাসের ৯ তারিখে রাতে খবর পেলাম কাম্পাসের ই অন্য একটি বিতর্ক সংগঠন ১১,১২,১৩ তারিখ আন্ত বিভাগের তারিখ ঘোষণা করেছে। (তারিখ গুলো দি একদিন এদিক সেদিক হতে পারে)। সবার মাথায় রক্ত উঠে গেছে। সুস্থ প্রতিজগীতার অংশ বলে মনে হচ্ছিল না বিষয়টা। কেমন জানি অশোভন।  সবাই বসে সিধান্ত নিলাম তারা তাদের মত প্রোগ্রাম করবে আর আমরা আমদের মত। পূর্ব ঘোষিত তারিখেই। অনুষ্ঠানের মান দিয়ে বিচার হোক। একই সাথে সিধান্ত হল অনুষ্ঠানের কলেবর বাড়ানোর। ১ম ন্যাশনাল ফেস্ট। কয়েকদিন মাত্র সময় হাতে। কোন স্পন্সর নেই। আমাদের মাঝের কেউ কেউ তার মোবাইল কেউ বা সংগ্রহে থাকা ডিভিডি কালেকশন গোপনে বিক্রি করার চেষ্টা শুরু করল। কিভাবে যেন এই খবর চলে গেল হীম এর কাছে। স্পন্সর জোগাড় না করে ভাত খাব না- প্রতিজ্ঞা করে ছেলেটি বেরিয়ে গেল ক্যাম্পাস থেকে।পরের দিন রাতে ফিরে এল BDNEWS24.COM এর স্পন্সর সহ। সবকটি বিভাগের অংশগ্রহনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হোল আন্তবিভাগ আর ঢাকা ও ঢাকার বাইরের স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ গ্রহনে বর্ণিল ন্যাশ্নাল ফেস্ট। যতদিন এই আবেগ এই ভালবাসা থাকবে, অশুভ শক্তির কোন সাধ্য নেই আমাদের থামাবার।
০৪.
মেহেদি তখন প্রেসিডেন্ট। আন্তঃবিভাগ মাত্র শেষ। একদিন সন্ধ্যায় দেখি ছেলেটা চুপচাপ মেহের চত্বরে বসে আছে। কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলাম যে মন খারাপ কেন? মেহেদী বললো যে ভাই প্রোগ্রাম শেষে ব্যস্ততা শেষ। তাই নাকি ওর ভাল লাগছে না। আদি ও অকৃত্রিম এই আবেগ আর কোথাও দেখেছি বলে মনে হয় না।
স্পন্সর এর টাকা পাওয়া যাবে একটু দেরীতে। নগদ কিছু টাকার প্রয়োজন। ছেলেটির বাবা বেচে নেই। মা অসুস্থ। অনেকগুলা টিউশনি করে। কেউ কিছু বলার আগেই নিজে দশ হাজার টাকা নিয়ে চলে আসলো। এই ধরনের ভালবাসার প্রতিদান কিভাবে দিতে হয় তা জানা নেই। সৌরভ, আমরা কৃতজ্ঞ।
অপু এখন আর প্রেসিডেন্ট না। কিন্তু প্রতিটি মুহূর্তে সংগঠন নিয়ে ভাবে। কোথায় কি হচ্ছে, কেন হচ্ছে, কি হলে ভাল হয় কিংবা সংগঠন থেকে বেরিয়ে যাবার পর কার কি অবস্থা সব ওর নখ দর্পণে। দেশের অন্যান্য বিতর্ক সংগঠনগুলো তে যখন মেয়াদ শেষ হবার পর অনেকে নিজ ক্লাবে ঢুকতে পারে না সেখানে অপুর এই অসামান্য গ্রহন যোগ্যতা অপুর ভালবাসার প্রতি সংগঠনের সামান্য প্রতিদান।

০৫.
কৌশিকের একটা লেখার খানিকটা অংশ অনেকটা এরকম ছিল যে “বিতার্কিক সৃষ্টির কারিগর জেইউডিও। তাই হয়তো অনেক সংগঠন স্কুল কলেজে বিতর্ক করে আসা বিতার্কিকদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর তাদের ছেঁকে তুলে নিয়ে তাদের দিয়ে বিতর্ক করিয়ে অনেক ট্রফি অর্জন করে এবং দম্ভিত ভঙ্গিমায় পদচারন করে বিতর্কের ভুবনে, তাদের মতো ট্রফি সর্বস্বতা আমাদের নেই। ১০০টি ট্রফি অর্জনের চেয়েও একজন সাধারণ ছেলেকে বা মেয়েকে একজন প্রতিষ্ঠিত বিতার্কিক কিসেবে গড়ে তোলাটাই জেইউডিও এর কাছে বেশী গৌরবের। কারণ জেইউডিও বিশ্বাস করে ট্রফি হয়তো শেলফে সাজিয়ে রাখা যায়, তবে একজন মানুষের মধ্যে বিতর্কের চেতনা শেলফে নয় হৃদয়ে গ্রথিত রাখা যায় অবিনশ্বর রূপে।’’
বিগত ১০ বছরে সারাদেশে যদি দেবতুল্য বিতারকিকদের তালিকা তৈরী করা হয় তবে কৌশিক আজাদ প্রনয়, জাফর সাদিক, ফারাহ ফিবা, রেহ্নুমা তারান্নুম, সাইয়েদ মোহাম্মদ তাইয়েব কিংবা দেবাংশু শুভ এর নাম প্রথম দিকে থাকবে এ বিষয়ে অন্তত কারো কোন সন্দেহ নেই অথচ এরা কেউই আগে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে বিতর্ক করেনি।
০৬.
এখন পর্যন্ত ধারাবাহিক ও নিয়মতান্ত্রিক গনতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত রেখেছে JUDO। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১০ বছরে আবর্তিত হয়েছে ৯টি কমিটি। ২৩ ডিসেম্বরের পরে মেয়াদ উত্তীর্ণ ভাবে থাকেনি কেউই। শুরুর দিকে বর্ষপূর্তির একটা কেক কেনার জন্য অনেক কষ্ট হত। প্রথম দুই একটা কেক হয়ত আমি কিনেছি অথচ এখন সাড়ম্বরে আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করি। নিষ্ঠার সাথে অর্জুনের মত JUDO এর নজর শুধু সেই মাছের চোখের দিকে। যার ফসল এই সফল ১০ বছর পূর্তি। (একটা গপন কথা বলি। বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানগুলোতে কেন জানি বার বার চোখ ভিজে ওঠে। কাউকে দেখতে দেই না, কিন্তু মন কেমন যেন ডুকরে ওঠে। হয়ত গর্বে, হয়ত ভালবাসায়। কে জানে?)
০৭.
ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে আসার পর প্রতিক্ষা থাকে কখন একটি প্রোগ্রাম আসবে, কবে ক্যাম্পাসে যাব। সারা দিন শেষে সারা রাত তুমুল আড্ডা, কার্ড খেলা দুষ্টুমি। আবার ভোর বেলায় হয় নতুন করে অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া নয়ত কর্ম জীবনে প্রবেশ করা। মাত্র কয়েকটা ঘন্টা একসাথে থাকার জন্য নুর , জাফর, কিংবা সউমিক রাত এগারটার সময় চলে এসেছে আবার সারা রাত কাটিয়ে ভোর ছয়টার বাসে আবার কাজে। সাংগঠনিক সম্পরকের সুত্রিতা শেষ হয়েছে ব্যক্তিগত পরজায়ে। ছোট ভাই অথবা বোনেরা জীবনের যে কোন গুরুতপুরন সিধান্ত নেবার আগে পরামর্শ করে। সাজেশন চায়। ওরা অনেকেই (বেশীর ভাগই) আমার চেয়ে ভাল অবস্থানে। অনেকে ভুরু কুচকিয়ে প্রশ্ন করে জীবনে কি করলাম। মুচকি হাসি। কিছু বলি না। আমার মত সৌভাগ্য ঠিক কতজন মানুষের আছে যাদের এতগুলা ছোট ভাই আছে যারা ভালবাসে অকৃত্রিম ভাবে, বিপদে পাশে দাঁড়ায় বন্ধুর মত, সুখের নৌকায় পাল তোলা বাতাস দেয়?
শুধু ক্যাম্পাস কিংবা প্রোগ্রাম নয়। মনে চাইলেই ঢাকার যে কোন জায়গায় আমরা একসাথে হয়ে যাই।  হোক তা বসুন্ধরা সিটিতে, আনয়ারের চ এর দোকানে কিংবা অন্য কোথাও। রাগা রাগি, ক্ষোভ , ক্রোধ সবই আছে আমাদের মাঝে। কিন্তু দিন শেষে আমরা সবাই এক ও অদ্বিতীয়। এজন্যই JUDO নিজেকে সংগঠন বলে মনে করে না।
JUDO আজ একটি পূর্ণ একান্নবর্তী পরিবার।