Wednesday, 12 March 2014

একটি কনসার্ট একটি অক্ষমতা




আগামীকাল আমার অফিসের ঠিক পাশেই এ আর রাহমানের কনসার্ট। ওনার কনসার্ট প্রথম দেখি ২০০০ সালে। টি ভিতে। আমাদের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা চলছিল, তার মাঝে। মন্ত্রমুগ্ধদের দেখেছি অনুষ্ঠান। এবার আমার নিজের দেশে। দেখতে যাব বা দেখা উচিত এই জাতীয় কোন চিন্তা ছিল না। কিন্তু কোন একটা কারনে চিন্তা শুরু হয়েছে আর সেখান থেকেই এই লেখার সুত্রপাত।
বন্ধু রাকিব এখন নামকরা স্পোর্টস রিপোর্টার। সম্ভবত টিকেট প্রার্থীদের চাপে গতকাল সে ফেসবুকে একটা লিঙ্ক আপলোড করে। ওই লিঙ্কটাই যত নষ্টের গোঁড়া। চমৎকার একটি ওয়েব সাইটে টিকেটের মূল্য লেখা ২০০০-৭৫০০০ অনলি।
আমি, মামুন, বাংলাদেশের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেছি বর্তমানে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকে প্রথম শ্রেণীর একটি চাকুরী করছি। আমি আমার তিন মাসের রাষ্ট্র প্রদত্ত হালাল বেতন দিয়েও ওই কনসার্টের সর্বাধিক দামের টিকেট কেনার ক্ষমতা অর্জন করতে পারি নাই। তবে হ্যাঁ, মিনিমাম দামের টিকেটটি আমি কেনার সক্ষমতা অর্জন করেছি। কিন্তু তখনই আমার পাশের টেবিলে বসেন আমার মত অন্য কারো কথা মনে পড়ল। বেচারী তার দুটো ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ চালাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। অথচ তিনিও তার সময়ে সব চেয়ে ভাল ছাত্রদের একজন ছিলেন। তথাকথিত সরকারী চাকরী করেন। তার জন্য এই ২০০০ টাকা একজন গৃহ শিক্ষকের বেতন।
আপনারা দয়া করে মনে কিছু করবেন না। আপনারা ভাবতেই পারেন, যার টাকা আছে সে দেখবে, যার টাকা নেই তার দেখার প্রয়োজন নেই। একদম ঠিক ভাবনা। আমিও দ্বিমত করি না। আমি শুধু সেই সব মানুষের বাস্তব অবস্থার কথা বলতে চাই যাদের সাধ আছে কিন্তু সাধ্য নাই অথচ সাধ্য না থাকার কোন যৌক্তিক কারন নেই।
যে দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন সম্মানিত প্রধান শিক্ষক তৃতীয় শ্রেণীর পদমর্যাদা ভোগ (!!!!) করেন, যে দেশের প্রথম শ্রেণীর একজন সরকারী কর্মকর্তা তার পরিবার নিয়ে তিন বছরে একবার ও কোথাও বেড়াতে যাবার মত অর্থ, সৎ ভাবে যোগাড় করতে পারেন না, যে দেশে একজন চিকিৎসক পাশ দেবার পর পাড়ার ওষুধের দোকান হয় তার ঠিকানা, দুইশত টাকার জন্য একজন নব্য উকিল পেছন পেছন ঘোরেন একজন সিনিয়রের সেই দেশে মাত্র কয়েক ঘণ্টা সামনা সামনি গান শোনার মূল্য ৭৫০০০/=
আমি বিশ্বাস করি ও জানি, কোন আসনই খালি থাকবে না। অনেকের মনে আফসোস থেকে যাবে কাংখিত আসনটি না পাবার, কারো আফসোস হয়ত টিকেট না পাবার। বিশ্ব দরবারে সফল আয়োজনের জন্য আমারা আরও একবার প্রশংসিত হব। আমরা কখনই ভাববো না কনসার্টের সময় অফিস থেকে ফেরার পথে জ্যামে আটকে থাকা মানুষগুলোর দীর্ঘ নিঃশ্বাসের কথা, ভাববো না একি যোগ্যতায়ের দুজন মানুষের মাঝে ইচ্ছাকৃত ভাবে তৈরি আর্থিক শ্রেনী বিভেদের কথা। আমারা গান শুনবো, এফ এম রেডিও অথবা সিম্ফনি মোবাইল এ।
আমার ২ থেকে ৭৫ হাজার খরচ করার সামর্থ্য নেই ঠিক কিন্তু বাসে ঝুলতে ঝুলতে কানে হেডফোনে গান শোনার যে আনন্দ তা আমি লক্ষ টাকাতেও বিক্রি করব না।

Monday, 24 February 2014

২০০ টাকার গপ্পো




আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই তখন ২০০১। অল্প কিছু দিন পরেই বাবা চাকুরী থেকে অবসর নেন। খুব সীমিত টাকা পাঠাতেন। যতটা না হলেই না ঠিক ততটা। আমি এরই ফাঁকে হঠাৎ করেই যেন বড় হয়ে গেলাম। তখন আমি বাঁধন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সাধারন সম্পাদক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেট অর্গানাইজেশন এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। জড়িত ছিলাম একটি কেন্দ্রিয় বিতর্ক সংগঠনের সাথেও। প্রেম করাও শুরু করেছি। সিগারেট ও ধরেছি।  অনেক ছোট ভাই ফ্যান ফলোয়ার। প্রায় প্রতিদিনই ঢাকা থেকে কেউ না কেউ আসছে বেড়াতে। সবকিছু বাদ দিলেও শুধু চা এর খরচ মেটাতে আমাকে হিমশিম খেতে হত সবসময়। ক্যাম্পাস এর কিছু পিচ্চি ছিল। চা বিক্রি করত। ফ্লাস্ক ভেঙ্গে গেলে রাতে আল বেরুনি হলের ৮০৩ রুমের সামনে। কোন রিকশাওয়ালা অসুস্থ, মামুন এর কাছে গেলে টাকা পাওয়া জাবে। ভয়ানক বিপদ। মুখে কিছু বলতে পারি না অথচ পরে কষ্ট হত। আর্থিক। 

ভয়ানক বাতিক ছিল বই কেনার। সাধ ছিল কিন্ত সাধ্য ছিল খুব কম। কিন্তু তারপর ও মাঝে মাঝে পাগলামি করে ফেলতাম। মনে আছে যে শরদিন্দু এর ব্যোমকেশ সমগ্র কেনার পরে রাতে হলে ফিরে খুব চিন্তায় পড়ে গেছিলাম। বাকি সপ্তাহ কেমন করে চলবে!  

এর মানে কিন্তু এই নয় যে আমাকে অনেক অর্থ কষ্টে থাকতে হয়েছে। যখন টাকা চেয়েছি তখনই বাবা টাকা পাঠিয়েছেন। কিন্তু কত আর চাওায়া যায়। বন্ধু অথবা সংগঠনের চা এর খরচ এর জন্য তার কাছে টাকা চাইতে ইচ্ছা করত না।  
প্রতি মাসে একটা ডি ডি আসতো। ১৭ থেকে ২০ তারিখের মধ্যে শেষ। অবশ্য খাবার সমস্যা হত না। টাকা আসার সাথে সাথে ডাইনিং আর ক্যান্টিনে টাকা দিয়ে দিতাম। সমস্যা ছিল ক্যাশ টাকার। 

তারপর হটাত এক মাসে............
২৭ তারিখ বিকেলে পোস্ট অফিসের মামা দরজায় টোকা দিলেন। চিঠি এসেছে। খামের ওপর হাতের লেখা দেখে বুজলাম মেঝভাই এর । চিঠি খুলতেই দেখি কাগজের ভাজে চকচকে দুটো ১০০ টাকার দুটো নোট। চিঠিতে লেখা যে ইচ্ছামত খরচ করিস। এর পর থেকে প্রতি মাসের শেষে এই চিঠি এর নিয়মিত অপেক্ষা থাকতো। অস্থির এক অনুভূতি। 

আজ যত টাকাই রোজগার করি না কেন ওই ২০০ টাকার ফ্লেভার ভুলতে পারি না। ব্যাংক এ চাকুরী করার কারনে এখন মাসের বেতন হয় ২৫ তারিখে। বেতনের টাকা টা হাতে নিয়ে মাঝে মাঝে সেই হারিয়ে যাওয়া ২০০ টাকার গন্ধ খুজে ফিরি......