ছোটবেলা থেকেই আমি একটু বাবা ঘেসা ছিলাম। অন্য সবাই যখন মায়ের হয়ে কথা বলত
আমি কেন জানি বাবার পক্ষ নিতাম। খুব যে বন্ধুর মত সম্পক ছিল তা কিন্তু নয়। ভয়
পেতাম ভীষণ আবার কেন জানি কাছে থাকতে ইচ্ছা করত।
ছেলে বেলায় আমাকে জোরে জোরে বাংলা বই অথবা খবরের কাগজ পড়তে একরকম বাধ্য করা
হত। বড় ভাই বোনদের ইংলিশ টেক্সট বুক পড়াটাও ছিল আর এক বিরক্তির বিষয় । অফিস যাবার
আগে পড়া দিয়ে যেতেন আবার ফিরে এসে জিজ্ঞাসা করতেন পড়েছি কি না। না পড়ে থাকলে জোরে
জোরে পড়। খুব খুব খুব খারাপ লাগত। আমার মত চিৎকার করে আর কেউ পড়ে না। আজ আমার
উচ্চারন আর স্পষ্ট বাগ্মিতার প্রসংশা সবার মুখে, অন্য যে কার থেকে আমি ভালো ইংলিশ
বলি। কেউ জানে না বাবা, শুধু আমি জানি, কেন।
এইচ এস সি পরিক্ষার পর সবাই যখন চিন্তিত তখন তুমি নিশ্চিন্ত। আমি কোথায় পড়ব
, কি পড়ব তার পূর্ণ সাধিনতা আমার। পরীক্ষা দিতে গিয়ে কোথায় থাকব , কার কাছে যাবো
কিছুই বলনি। সীকার করছি যে কষ্ট পেয়েছিলাম। কিন্তু আজ বুঝি, সাবলম্বি হবার, নিজের
সিধান্ত নিজে নেবার হাতে খড়ী কোথা থেকে পেয়েছি। কেউ জানে না বাবা, শুধু আমি জানি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর প্রথম প্রথম হলে মন টিকত না। হয়ত অনেক রাতে
অনেক টা জার্নি করে বাড়ীর দরজায় আচমকা কড়া নাড়া, চোখ মুছতে মুছতে মা দরজা খুলে
দিত, রাতে আসার জন্য কিছুটা বকা দিলেও খুশির ভাব টা আমি সব সময় বুঝতে পেরেছি, শুধু
তোমায় বুঝতে দেই নি। কেউ জানে না বাবা, শুধু আমি জানি, কেন।
বিতর্ক করতাম। সাফল্য ও ছিল। আমার সামনে কোনদিন প্রসংশা কর নাই। কিন্তু আমার
অজান্তে ক্রেস্ট গুলো যত্ন করে রেখেছ। এলাকা, তোমার ব্যাংক অথবা পরিচিত এমন কেউ
নেই যাকে আমার গল্প তুমি করনি। কোন টি ভি প্রোগ্রাম থাকলে তোমার ফোন পায়নি এমন
আত্মীয় বোধহয় খুব কম ছিল। তবু সামনে কিছু বলোনি। কেউ জানে না বাবা, শুধু আমি জানি,
কেন।
পাসের পর ্প্রথমেই খুব ভালো চাকরি পাই নি। সবাই বিশ্বাস রাখতে পারছিল না,
এমন কি আমার প্রেমিকা পর্যন্ত। এক মাত্র উৎসাহ তুমি দিয়ে গেছো। ছোটখাটো যে কয়টি
প্রতিষ্ঠানে আমি কাজ করেছি সব গুলর পেপার কাটিং আমি দেখেছি তোমার খাটের তোষকের
নিচে। প্রতিটি ভাইভা দেবার পর সব গুলো প্রশনো একমাত্র তুমিই জানতে চেয়েছ। আর কেউ
না। আমার ওপর তোমার বিশ্বাস আমাকে নিজের ওপর বিশ্বাসী হতে শিখিয়েছে। শুধু তোমার
জন্য আজ আমি জানি যে আমি পারব। কেউ জানে না বাবা, শুধু আমি জানি, কেন।
প্রেম ছিল। নিজের এবং তোমার অপর বিশ্বাস ছিল। তাই প্রেমিকা কে বলেছিলাম
বাবার মত নিয়েই বিয়ে করব। ১৯৬৫ সালের স্নাতকত্তর তুমি, খুব কি আধুনিক ছিলে? তবু
তোমাকেই বলেছিলাম এবং আমার বিশ্বাস ভংগ হয়নি। অনেক ঘাত প্রতিঘাত এর মধেই তুমি আমার
সম্মান রেখেছ যদি ও শেষ অবধি দেখে যেতে পারনি। আজ আমি সুখেই সংসার করছি। কেউ জানে
না বাবা, শুধু আমি জানি, কেন।
যে রাতে তুমি চলে গেলে সে রাতে ল্যাব এইড এর বারান্দায় আমি ঘুমিয়ে ছিলাম।
আগের দুটো রাত ঘুমাইনি। খাওয়া দায়াও করিনি। কেন যেন এই রাতে পেট ভরে খেয়েছিলাম,
তাই হয়ত ঘুম টাও বেশি ছিল। তোমার সিটি স্ক্যান রিপোর্ট দেখার পর আমি জানতাম যে
তুমি আর হয়ত নেই। অন্য কাউকে বলিনি। এই জন্য এই কটা দিন আমি হাসপাতাল থেকে অন্য
কোথাও যাইনি। তুমি চলে যাওাতে আমি কিছু টা খুশি ছিলাম বাবা, তোমার মত প্রতাপশালী
মানুষ অসহায় এর মত বিছানাতে পড়ে থাকবে এটা মেনে নিতে পারছিলাম না। তোমার এই
শান্তিময় প্রস্থান আমার কাছে অনেক শান্তির। কেউ জানে না বাবা, শুধু আমি জানি, কেন।
আজ বাবা দিবস। সারা দিন অনেক কিছু পড়েছি, অনেকের কাছে তাদের বাবাদের গল্প
শুনেছি কিন্তু আমি কিছু বলিনি। কেউ জানে না বাবা, শুধু আমি জানি, কেন।