১৯৯৫ সালের দিকের কথা।
খুলনা জিলা স্কুলের মেইন রোডের উল্টা পাশে মুক্তা বই ঘর নামের একটা দোকান ছিল
(এখন আছে কিনা জানি না)। এক সপ্তাহের জন্য বই ভাড়া দিত। সপ্তাহ প্রতি দুই টাকা।
বেশির ভাগ পাওয়া যেত তিন গোয়েন্দা আর মাসুদ রানা। (সেবা প্রকাশনীর কাছে জাতির আসলে
কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। একটা বিশাল জনগোষ্ঠীকে এই প্রকাশনী বই পড়তে শিখিয়েছে)। অনেক
কস্ট করে টাকা জোগাড় করতে হত। দুই টাকা মানে অনেক টাকা। তারপর বই পড়ার একটা ঝক্কি
তো ছিলই! লুকিয়ে লুকিয়ে পড়া। বেশীর ভাগ সময়ে খেলার নাম করে মাঠে গিয়ে পড়তাম। এখন
গল্প বলে মনে হলেও এটাই সত্য যে আগে যারা গল্পের বই পড়ত তাদের অধিকাংশই ক্লাসের
বইয়ের নীচে রেখে বই পড়া শুরু করেছে (হাল আমলের নাটক সিনেমাতেও এই ঘটনা দেখায়)!
চাকুরী জনিত কারনে বাবা বদলি হয়ে চলে এলেন সাতক্ষীরা। আমাদের বাসা নেওয়া হল
পলাশপল নামক একটা জায়গায়। ভর্তি হলাম সাতক্ষীরা জিলা স্কুলে। আমার জন্য বরাদ্দ
দেয়া হল দিন প্রতি দশ টাকা। দুই বারের রিকশা ভাড়া চার টাকা করে আট টাকা আর টিফিনের
বরাদ্দ দুই টাকা। স্কুলে যাবার সময় কিছুটা হেটে তারপর রিকশাতে উঠতাম। এক টাকা বেচে
যেত। ফেরার সময় কোন বন্ধুর সাইকেলে। আর টিফিনের টাকা যদি বাচাতাম তাহলে তো
পোয়াবারো। প্রতি সপ্তাহে গড়ে দুইটা করে বই কেনা হত।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঠার পর নিলক্ষেতকে তীর্থ স্থান মনে হত। সীমিত টাকা। কিন্তু
অসংখ্য বই। কি কিনব বুঝে উঠতে পারতাম না। রেল স্টেশন আরও একটা প্রিয় জায়গা ছিল।
নতুন বের হওয়া প্রায় সব বই স্টেশনের বুক ডিপো গুলতে পাওয়া যেত।
সাম্প্রতিক সময়ে ফিরে আসি।
কিছু দিন আগে কোন এক কারনে কয়েকদিনের জন্য রামপুরা থাকতে হয়েছিল। হাতে তেমন
কোন কাজ নেই। বের হলাম বই কেনার জন্য। অদ্ভুত বিষয় হল, পুরো রাম্পুরা বাজার চষে
ফেলেও আমি কোন মান সম্মত বইয়ের দোকান পেলাম না। অথচ আগে প্রতি পাড়া-মহল্লাতে কম
করে হলেও দুটো করে বইয়ের দোকান দেখা যেত। এলাকার বেকার যুবকদের কর্ম সংস্থানের
রাস্তা ছিল হয় কোচিং সেন্টার নয়ত বইয়ের দোকান। নিলক্ষেতেও এখনও প্রচুর বই। কিন্তু
অমুক পরীক্ষার প্রস্তুতি গাইড অথবা রান্না-সেক্স-৩০ দিনে ভাষা শিখুন বইয়ের যে
পরিমান প্রাচুরজ্য তার তুলনায় গল্প প্রবন্ধের বই নেই বললেই চলে। রেল স্টেশনের বুক
ডিপো গুলতে এখন চা-পান-সিগারেটের দোকান।
বইয়ের বাজার প্রথমে দখল করে মোবাইলের দোকান। তার পরে ডিভিডি। বর্তমানে
সাইবার ক্যাফে। এখন ইন্টারনেটে ই-বুক নামে প্রচুর বই পাওয়া যায়। অনেক অনলাইন বাজার
ই-বুক রিডার নামক একটি ডিভাইস বিক্রির
চেস্টা চালাচ্ছে। কিন্তু নতুন অথবা পুরাতন একটা বই হাতে নিয়ে পাতা উল্টে পড়ার যে
ফ্লেভার তা কেন যেন এই মোবাইল অথবা কম্পিউটার স্ক্রিনে পড়ে সেই মজাটা পাই না। হয়ত
আমরা ব্যাকডেটেড হয়ে গেছি!
বর্তমান প্রজন্ম কেন জানি আশংকাজনক ভাবে পাঠ্য পুস্তক ছাড়া অন্য বই পড়ার
আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। (অবশ্য পাঠ্য পুস্তকের প্রতিও যে এদের অনেক আগ্রহ আমি সে কথা জোর
গলায় বলছি না)। যারা কিছুটা বই পড়েন
তারা হুমায়ূন আহমেদ অথবা মুহাম্মদ জাফর ইকবালেই থেমে আছেন। বাংলাদেশী সাহিত্য জগতে
এই দুইজনের অবদান অসামান্য। কিন্তু এই দুই জনের
বাইরেও একটা জগত আছে। এক সময় কৈশোর শুরু হত মাসুদ রানা কিংবা তিন গোয়েন্দার হাত
ধরে। তারপরে বাধ্যতামূলক ভাবে আসত সমরেশ এর গর্ভধারিণী। কৈশোরের রোমান্টিসিজমের
জন্য নিশ্চিত করা ছিল শেষের কবিতা আর মেমসাহেব। সাথে হুমায়ূন আহমেদ আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তো
ছিলেন ই। নব্বুই এর দশকে বই পড়ত অথচ হেলাল হাফিজের যে জলে আগুন জ্বলে পড়ে নাই এমন মানুষ হাতে গুনে বলে দেয়া যায়। আর একটু
পরিনত হলেই হুমায়ন আজাদ।
এখনকার তরুন্দের মাঝে কবিতা পড়ে এমন সংখ্যাটা খুজতে হয়ত আতশী কাঁচ লাগবে। যারা
পড়েন তাদেরকে, যারা পড়েন না, তারা ঠোঁট বাকিয়ে বলেন আঁতেল। আবার যারা পড়েন তাদের
অধিকাংশই কেন জানি নিজেদের আলাদা করে দেখতে পছন্দ করেন। গালে দাড়ি চুলে বাবরি
কিংবা হাতে শান্তি নিকেতনি ব্যাগ আর পায়ে চটি। আসলেই কি সাহিত্য সচেতন হবার জন্য
এই গেট আপের তুমুল দরকার?
যে ছেলেটা সন্ধ্যায় ঘন্টার পর ঘন্টা পার করে দেয় পুল খেলতে অথবা গলির মোড়ে চায়ের
দোকানে, যে মেয়েটা রাতভর সময় দেয় ফেসবুককে বা তার ফোন ফ্রেন্ড কে সেই মানুষগুলোর
হাতে কেন আমরা বই তুলে দিতে পারছি না তা ভেবে দেখা দরকার। শুধু মাত্র জীবন যাত্রার
মানের পরিবর্তন অথবা সময় অনেক বদলে গেছে এই দোহাই দিয়ে আসলেই কি পার পাওয়া যাবে?
বেশ কয়েকজনের সাথে কথা হল বই পড়া নিয়ে। তাদের কথাও যুক্তিযুক্ত। তারা বলছেন
এখনকার সময়ে প্রায় সমস্ত বিখ্যাত বই নিয়েই মুভি তৈরি হচ্ছে। তারা সবাই মুভি
দেখছেন। কিন্তু মুভিটা দেখার আগে যদি বইটা পড়া থাকে তবে দেখার অনুভুতি বেড়ে যায়
কয়েকগুণ। মনে করুন দ্যা ভিঞ্চি কোড বইটাতে প্যারিসের ল্যুভর মিউজিয়ামের বিস্তারিত
বর্ণনা দেয়া আছে। ৬৬৬ টুকরা দিয়ে তৈরী কাচের পিরামিডের কথা বলা আছে। পড়ার সময়
নিজের ভেতর এক ধরনের কল্পনা তৈরী হয়। সেই কল্পনার বাস্তব রুপ যখন চলচিত্রের রুপালী
পর্দায় ফুটে ওঠে তখন এক অন্য ধরনের আবেশ কাজ করে। আবার অনেক সময় চলচিত্র বইয়ের
সত্ত্বার সব কিছু তুলে ধরতে পারে না। বইয়ের পাতার শারলক হোমস মুভির চেয়ে অনেক
আলাদা, অনেক বেশী জীবন্ত, প্রাণবন্ত। সত্যি কথা বলতে কি, বই এর বিকল্প আসলে আর
কিছুই হতে পারে না, বই বইই।
বিতর্কের বিচার কাজ করছি প্রায় বছর দশ হতে চলল। শেষ কবে কোন বিতর্কে কোন
বিতারকিক দুটো কবিতার লাইন বলেছিল মনে করতে পারি না। বিশয়ের সাথে সাহিত্যের
যোগসূত্র দেখানো তো অনেক দুরের বিষয়। আমি বলছি না যে এরা ভাল বিতর্ক করে না,
কিন্তু সব বিতর্কই কেন জানি এক রকম মনে হয়। অনেকটা বাংলা ছায়াছবির মত। প্রথম দশ
মিনিটেই বলে দেয়া যায় শেষের অংকে কি হবে!
নতুন লেখকদের বই আমরা খুব বেশী প্রচার না পেলে পড়ি না। এঁরা নিজের পকেটের
টাকায় বই ছাপিয়ে হতাশ হয়ে বসে থাকেন বই মেলায়। এদের উতসাহ দেয়াটা অনেক জরুরী।
অনেক দিন ধরে পড়ে থাকলে বইয়ের মলাটে যেমন ধুলো পড়ে যায় তেমনি বই পড়ার
আগ্রহের ওপর ও কেমন যেন একটা আস্তরণ পড়ে গেছে। এই ধুলো পরিস্কার করার উদ্যগ আমাদের
ই নিতে হবে নতুন করে। যুক্তিবাদী সমাজ গড়ার প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে বই পড়ার আগ্রহকে
আবার জাগিয়ে তুলতে হবে, এর অন্য কোন বিকল্প নেই।
প্রতিটি বিতর্ক ক্লাবে একটি করে লাইব্রেরী গড়ে তোলাটা কি খুবই অসম্ভব কাজ?
অনেক বেশি জীবন্ত লাগলো কথা গুলো যেগুলো হয়তো আমিও প্রায়ই ভাবি, কিন্তু তুমি তোমার লেখায় তুলে ধরলে ভাই।
ReplyDelete